বৃহস্পতিবার ৫ই মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২০শে ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

শিরোনাম >>
শিরোনাম >>
পাঠকের অভিমত

সিগারেট পরিবেশ ও মানুষকে নীরবে ধ্বংস করে দিচ্ছে

সুইটি রহমান   |   বুধবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৫   |   প্রিন্ট   |   ৯০ বার পঠিত   |   পড়ুন মিনিটে

সিগারেট পরিবেশ ও মানুষকে নীরবে ধ্বংস করে দিচ্ছে

ধূমপান আমাদের সমাজে দীর্ঘদিনের একটি অভ্যাস। অনেকেই মনে করেন, একটি সিগারেট টানলে ক্ষতি তেমন কিছু হয় না। কিন্তু বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন।একটি মাত্র সিগারেটের ধোঁয়াই বাতাসকে দূষিত করতে পারে, পরিবেশের ক্ষতি করে এবং ধূমপান না করা মানুষের শরীরেও ভয়াবহ প্রভাব ফেলে।একদিকে ধূমপায়ী নিজেকে ধ্বংস করছে, অন্যদিকে তার আশেপাশের মানুষও অনিচ্ছাসত্ত্বেও একই ক্ষতির অংশীদার হচ্ছে। এ কারণে ধূমপান শুধু ব্যক্তিগত অভ্যাস নয়, বরং সামাজিক ও পরিবেশগত সংকট।

পরিবেশের ওপর সিগারেটের প্রভাব :

একটি সিগারেট জ্বালানোর সাথে সাথে তার থেকে নির্গত ধোঁয়ায় থাকে হাজারো রাসায়নিক পদার্থ। গবেষণায় দেখা গেছে, একটি সিগারেট থেকে নির্গত ধোঁয়ায় সাত হাজারেরও বেশি রাসায়নিক থাকে, যার মধ্যে কমপক্ষে সত্তরেরও বেশি ক্যানসার সৃষ্টি করতে পারে। এগুলো শুধু মানুষের শরীরেই ক্ষতি করে না, বরং বাতাসে মিশে গিয়ে বায়ুমণ্ডলকে দূষিত করে।

প্রথমত, সিগারেট জ্বালানোর ফলে কার্বন ডাইঅক্সাইড, কার্বন মনোক্সাইড, মিথেন এবং নাইট্রাস অক্সাইডের মতো গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গত হয়। একটি সিগারেট পোড়ালে প্রায় ১৪ গ্রাম কার্বন ডাইঅক্সাইড বাতাসে মিশে যায়। এই পরিমাণ শুনতে সামান্য মনে হলেও প্রতিদিন পৃথিবীতে কোটি কোটি সিগারেট খাওয়া হয়, যার ফলে বছরে প্রায় ৮৪ মিলিয়ন টন কার্বন ডাইঅক্সাইড নির্গত হয়। জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য দায়ী এই গ্যাসগুলো পৃথিবীর উষ্ণতা বাড়াচ্ছে, বরফ গলছে, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পাচ্ছে।

দ্বিতীয়ত, সিগারেটের ধোঁয়ায় থাকা নামক ক্ষুদ্র কণাগুলো বাতাসে দীর্ঘসময় ভেসে থাকে। এই ক্ষুদ্র কণা সহজে চোখে দেখা যায় না, কিন্তু শ্বাসপ্রশ্বাসের মাধ্যমে মানবদেহে প্রবেশ করে ফুসফুসে জমা হয়। বায়ুর মান মাপার একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হলো, যা বেড়ে গেলে শহরের এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স দ্রুত খারাপ হয়ে যায়। একটি সিগারেটের ধোঁয়াই ঘরের বাতাসকে অনেকখানি দূষিত করে ফেলতে পারে।

তৃতীয়ত, সিগারেটের ধোঁয়ায় থাকা ক্ষতিকর রাসায়নিক যেমন আর্সেনিক, বেনজিন, ফর্মালডিহাইড, অ্যামোনিয়া শুধু বাতাসেই নয়, আশেপাশের মাটি ও পানিতেও মিশে যায়। দীর্ঘমেয়াদে এগুলো পরিবেশে জমে থেকে উদ্ভিদ ও প্রাণীর জন্য বিষাক্ত হয়ে ওঠে। এতে খাদ্যশৃঙ্খলেও বিষ ঢুকে পড়ে।

ধূমপান না করেও ঝুঁকি ডেকে আনছে মানুষ :

ধূমপায়ী নিজের ইচ্ছায় সিগারেট টানলেও আশেপাশের মানুষকে সে অনিচ্ছাসত্ত্বেও ধূমপান করায়। এটাকেই বলে পরোক্ষ ধূমপান বা সেকেন্ড হ্যান্ড স্মোক। একটি সিগারেট টানার সময় ধূমপায়ীর শরীরে যেমন ক্ষতিকর রাসায়নিক প্রবেশ করে, তার চেয়ে অনেক সময় বেশি পরিমাণে বিষাক্ত উপাদান আশেপাশে ছড়িয়ে পড়ে।অর্থাৎ ধূমপান না করলেও পাশের মানুষও সমান ক্ষতির শিকার হয়। ধূমপান না করা মানুষদের জন্য একটি সিগারেটের ধোঁয়া তাৎক্ষণিকভাবে চোখে জ্বালা, গলা শুকিয়ে যাওয়া, কাশি ও মাথাব্যথার কারণ হয়। বিশেষ করে শিশুরা এ ধোঁয়ার কারণে দ্রুত প্রভাবিত হয়। তাদের শ্বাসকষ্ট, নিউমোনিয়া বা হাঁপানির ঝুঁকি বেড়ে যায়। গর্ভবতী নারীর শরীরে ধোঁয়া প্রবেশ করলে তা ভ্রূণের বৃদ্ধি ব্যাহত করতে পারে।

দীর্ঘমেয়াদে পরোক্ষ ধূমপান আরও ভয়াবহ ফল বয়ে আনে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব অনুযায়ী প্রতিবছর প্রায় ১৩ লাখ মানুষ মারা যায় শুধু পরোক্ষ ধূমপানের কারণে। এদের অনেকেই কখনো জীবনে সিগারেট ধরেননি, তবুও ধূমপায়ীদের আশেপাশে থাকার কারণে ধীরে ধীরে তারা মারাত্মক রোগে আক্রান্ত হয়েছেন। হৃদরোগ, ফুসফুসের ক্যানসার, ব্রঙ্কাইটিস ও হাঁপানি – এসব রোগের অন্যতম কারণ হলো পরোক্ষ ধূমপান।

ইনডোর এয়ার পলিউশন :

বেশিরভাগ মানুষ মনে করেন, বাইরে ধূমপান করলে ক্ষতি কম হয়। কিন্তু অনেকেই ঘরের ভেতরে বা বন্ধ জায়গায় ধূমপান করেন। একটি সিগারেটের ধোঁয়া ছোট ঘরে কয়েক ঘণ্টা পর্যন্ত টিকে থাকতে পারে। এতে ঘরের বাতাস দূষিত হয়ে যায় এবং যারা সেখানে থাকে তারা ধীরে ধীরে ক্ষতিকর পদার্থ শ্বাসের মাধ্যমে গ্রহণ করে।

শিশু ও বৃদ্ধদের জন্য এটি সবচেয়ে ভয়ংকর। শিশুদের ফুসফুস এখনও পুরোপুরি গড়ে ওঠেনি, তাই ধোঁয়ার প্রভাবে তাদের ফুসফুসের বৃদ্ধি ব্যাহত হয়। আর বৃদ্ধদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল থাকে, ফলে তারা দ্রুত অসুস্থ হয়ে পড়েন।

সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব :

একটি সিগারেটের ধোঁয়া শুধু স্বাস্থ্য বা পরিবেশের ক্ষতি করে না, এর কারণে সমাজ ও অর্থনীতিতেও বিরূপ প্রভাব পড়ে। ধূমপানের কারণে যেসব রোগ হয়, তা চিকিৎসা করতে বিপুল অর্থ ব্যয় হয়। অনেক মানুষ অকালেই কর্মক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। এর ফলে পরিবার ও রাষ্ট্র উভয়ের ওপর চাপ পড়ে। পরিবেশ দূষণের কারণে কৃষি উৎপাদন কমে যেতে পারে, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি বেড়ে যায়।

ধূমপান নিয়ন্ত্রণে করণীয় :

ধূমপানের ক্ষতি থেকে বাঁচতে সচেতনতা তৈরি করা জরুরি। একটি সিগারেটের ক্ষতিও যে ভয়াবহ হতে পারে, তা মানুষকে বোঝানো দরকার। জনসমাগমস্থলে ধূমপান নিষিদ্ধ করা, কঠোরভাবে আইন প্রয়োগ করা, ধূমপানবিরোধী প্রচারণা চালানো – এসব কার্যক্রম আরও জোরদার করা উচিত।

বিশ্বের অনেক দেশে ইতোমধ্যেই রেস্টুরেন্ট, অফিস, বাস, ট্রেনসহ জনবহুল স্থানে ধূমপান সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। বাংলাদেশেও আইন রয়েছে, তবে এর প্রয়োগ দুর্বল। আইন প্রয়োগের পাশাপাশি বিকল্প হিসেবে মানুষকে ধূমপান ছাড়ার উপায় শেখানো দরকার। নিকোটিন রিপ্লেসমেন্ট থেরাপি, কাউন্সেলিং, সাপোর্ট গ্রুপ এসবের মাধ্যমে অনেকেই ধূমপান ছাড়তে সক্ষম হয়েছেন।

একটি সিগারেটকে তুচ্ছ ভেবে অবহেলা করা যাবে না। এটি শুধু একজন ধূমপায়ীর শরীরকেই ক্ষতি করে না, বরং পরিবেশ, আশেপাশের মানুষ ও সমাজকে ধীরে ধীরে বিপদের দিকে ঠেলে দেয়। ধূমপানের ধোঁয়া হলো এক নীরব ঘাতক, যা প্রতিদিন কোটি কোটি মানুষকে অসুস্থ করছে এবং লক্ষ লক্ষ প্রাণ কেড়ে নিচ্ছে। তাই ধূমপানবিরোধী কার্যক্রমকে আরও শক্তিশালী করা এবং মানুষকে সচেতন করা এখন সময়ের দাবি।

 

লেখক, সুইটি রহমান, শিক্ষার্থী মৃত্তিকা ও পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগ, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়।

Facebook Comments Box
আরও
Chief Editor
Shahan Ahmed Chowdhury
Editor
J U Sumon
News Editor
Mehdi Hassan
UK Office
USA OFFICE
  • Hasan Hafizur Rahman
    264/A,Central Avenue
    Garden City
    NY 11040
    USA
সিলেট ব্যুরো
  • আব্দুর মুক্তাদির
    সিটি কর্পোরেশন মার্কেট (২য় তলা)
    চালিবন্দর, সোবহানীঘাট, সিলেট।
ঢাকা ব্যুরো
  • সৈয়দ আবু নাসের
    এমএস প্লাজা ২৮/সি/২ টয়েনবি সার্কুলার রোড, মতিঝিল বা/এ, ঢাকা-১০০০